রাউজানে এমপির ত্রাসে বিভীষিকার দুই যুগ


চট্টগ্রাম জেলার রাউজান উপজেলা। অনেকের কাছেই এটি ভয়ংকর এক জনপদের নাম। দুই যুগ ধরে সেখানে ঘটেছে একের পর এক গা শিউরে ওঠার মতো ভয়ংকর অপরাধ। হাজার হাজার মানুষকে নির্মম অত্যাচার, নিপীড়ন, গুম-খুন, হামলা-মামলা, জমি দখল, ধর্ষণ, সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন, যৌন নিপীড়নসহ এমন কোনো ঘৃণ্য কাজ নেই, যা হয়নি এই উপজেলায়। শুধু সাধারণ মানুষ নয়, বিএনপি-জামায়াতসহ প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক কর্মী, মুনিরিয়া যুব তাবলিগ কমিটির ভক্ত থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মীও নির্যাতিত হয়েছেন। হত্যা ও গুমের শিকার হয়েছেন অসংখ্য মানুষ। ভাঙচুর করা হয়েছে বাড়িঘর, মসজিদ, মন্দির, মাজার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। তবুও প্রতিবাদ দূরের কথা, মুখ খুলতেও সাহস পায়নি কেউ। কারণ, সব অপরাধের মূল হোতা ছিলেন ওই এলাকার সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী। দীর্ঘ ২৪ বছর রাউজানে ত্রাসের রাজত্ব চলেছে তার। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর একে একে মুখ খুলতে শুরু করেছে রাউজানের নির্যাতিত মানুষ।

গুম, খুন ও নির্যাতনের অভিযোগে এখন পর্যন্ত রাউজান ও চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন থানায় তার বিরুদ্ধে আটটি মামলা হয়েছে। চট্টগ্রাম-৬ আসনের সাবেক এই সংসদ সদস্য ভারতে পালাতে গিয়ে গত বৃহস্পতিবার আখাউড়া সীমান্তে বিজিবির কাছে ধরা পড়েছেন।

বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য থেকে জানা যায়, ফজলে করিম চৌধুরী ২০১৯ সালে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রকাশিত রাজাকার তালিকায় থাকা একেএম ফজলুল কবির চৌধুরীর সন্তান। নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে আওয়ামী লীগের বিরোধী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এনডিপি) কর্মী ছিলেন তিনি। ১৯৯৪ সালে এনডিপির শীর্ষ নেতার সঙ্গে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হন ফজলে করিম। সেই সূত্র ধরে এনডিপির আলোচিত ক্যাডার এসকান্দরসহ ৪০ থেকে ৪৫ জনকে নিয়ে এনডিপি থেকে পদত্যাগ করেন। পরে নিকটাত্মীয় সাবের হোসেন চৌধুরীর মাধ্যমে রাউজানে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হন। এমনকি ১৯৯৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে দলটির মনোনয়নও বাগিয়ে নেন। তবে সেবার বিপুল ভোটে হেরে যান। এরপর ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চাচাতো ভাই বিএনপি নেতা গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে ৭ হাজার ৩২৯ ভোটে হারিয়ে চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনের এমপি নির্বাচিত হন ফজলে করিম চৌধুরী। ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালেও আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে এমপি হন তিনি।

সরেজমিন রাউজান ঘুরে জানা যায়, ফজলে করিম চৌধুরী ওরফে জুইন্যা এতটাই দোর্দণ্ড প্রতাপশালী ছিলেন যে তার অত্যাচারে অতিষ্ঠ ছিল রাউজানবাসী। তিনি উপজেলাজুড়ে কায়েম করেছিলেন একনায়কতন্ত্র। শুধু বিএনপি, জামায়াত কিংবা মুনিরিয়া যুব তাবলিগ নয়, ফজলে করিম চৌধুরীর বিরুদ্ধে থাকলে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের এলাকা ছাড়তে হতো। তার কথার বাইরে যাওয়ার সুযোগ ছিল না প্রশাসনেরও। উন্নয়ন কাজের টেন্ডার থেকে শুরু করে সরকারি নিয়োগসহ সবকিছুই হতো তার নির্দেশে। তাকে ম্যানেজ করা ছাড়া জনপ্রতিনিধি হওয়ার উপায় ছিল না কারও। নির্বাচিত হয়েও এমপির রোষানলে পড়ে পৌরসভার অফিসে যেতে পারেননি সাবেক মেয়র দেবাশীষ পালিত। দিনেদুপুরে হত্যা, অত্যাচার, গুম, হামলা, মামলা, ভাঙচুর ছিল তার নিত্যদিনের কাজ।

এসব অভিযোগের বিষয়ে কথা বলার জন্য গ্রেপ্তারের আগে বেশ কয়েক দিন এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীর রাউজানের বাড়িতে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। মোবাইল ফোনে অনেকবার কল করা হলেও তার নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়।

রাউজানের বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ফজলে করিম চৌধুরীর অনুসারীদের আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের তাদের অধিকাংশই সাবেক এনডিপি ক্যাডার।

অত্যাচারে অতিষ্ঠ ছিল সাধারণ মানুষ:

গত ৫ আগস্ট রাতে ফজলে করিম চৌধুরীর বাগানবাড়ি থেকে এক কৃষি শ্রমিকের রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তার নাম মুহাম্মদ ইউসুফ মিয়া (৫৫)। প্রায় এক বছর আগে তিনি সাবেক এমপির কাজ ছেড়ে দেন। পুলিশ জানায়, নিহত ব্যক্তির শরীরের বিভিন্ন স্থানে কুপিয়ে জখম করা হয়েছে।

নিহত ইউসুফ মিয়ার ছেলে মুহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন বলেন, তার বাবা সাবেক সংসদ সদস্যের ওই বাগানবাড়ির ব্যবস্থাপকের কাছে মজুরি বাবদ ২৬ হাজার টাকা পাওনা রয়েছেন। পাওনা চাওয়ায় তার বাবাকে একাধিকবার শাসানো হয়েছে। পরে বাগানবাড়ির ভেতর তার বাবাকে খুন করা হয়।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হাসান বিল্ডার্সের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ হাসান বলেন, এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী আওয়ামী লীগে যুক্ত হওয়ার পর ১৯৯৬ সাল থেকেই আমি এলাকায় যেতে পারতাম না। ২০১৯ সালে আমার আব্বা যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার শামসুল আলম মারা যান। আমার আব্বার জিয়াফত অনুষ্ঠানও চুপি চুপি করতে হয়েছে। তিনি রাউজানকে একটি আতঙ্কের উপজেলায় রূপ দিয়েছিলেন।

বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন:

২০১৭ সালের ২৯ মার্চ ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-সাধারণ সম্পাদক নুরুল আলম নুরুকে ফজলে করিমের নির্দেশে হত্যা করা হয়। সেই ঘটনায় সাত বছর পর রাউজান থানায় মামলা দায়ের করেছেন তার স্ত্রী সুমি আক্তার। এতে সাবেক সংসদ সদস্য ফজলে করিম চৌধুরীসহ ১৭ জনকে আসামি করা হয়েছে।

নুরুল আলমের স্ত্রী সুমি আক্তার বলেন, ‘আমার সামনে থেকে স্বামীকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে নির্মম নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছে। আমি স্বামী হত্যার বিচার চাই। জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’

এবিএম ফজলে করিমের নির্দেশে আবু জাফর চেয়ারম্যানকে অপহরণ করা হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। লন্ডনভিত্তিক একটি অনলাইন টিভি চ্যানেলের টকশোতে সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা হাসিনুর রহমান দাবি করেন, ২০০৮ সালের শেষদিকে রাউজানের একজন এমপি আমাকে একজন চেয়ারম্যানকে গ্রেপ্তার করে ক্রসফায়ার করতে বলে। সে এমপির আমি কথা শুনিনি।’

২০১০ সালের ২৭ মার্চ থেকে পরিবারের সদস্যরা সৈয়দ আবু জাফরের প্রতীক্ষায় আছেন। বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তার সন্তান জিসানুর রহমান।

চট্টগ্রাম উত্তর জেলা যুবদলের সহসভাপতি সাবের সুলতান কাজল কালবেলাকে বলেন, ‘ফজলে করিম চৌধুরীর অত্যাচার-হয়নারি এত পরিমাণে ছিল যে মাটিও কান্না করত। আমার বিরুদ্ধে তিনি ৫০টির অধিক মামলা দিয়েছিলেন। চট্টগ্রাম নগর থেকে শুরু করে এমন জায়গা নেই, যেখানে তিনি আমার বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য মিথ্যা মামলা দেননি। আওয়ামী লীগের গত ১৬ বছরে কখনো এলাকায় যেতে পারিনি।’

বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন:

২০১৭ সালের ২৯ মার্চ ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-সাধারণ সম্পাদক নুরুল আলম নুরুকে ফজলে করিমের নির্দেশে হত্যা করা হয়। সেই ঘটনায় সাত বছর পর রাউজান থানায় মামলা দায়ের করেছেন তার স্ত্রী সুমি আক্তার। এতে সাবেক সংসদ সদস্য ফজলে করিম চৌধুরীসহ ১৭ জনকে আসামি করা হয়েছে।

নুরুল আলমের স্ত্রী সুমি আক্তার বলেন, ‘আমার সামনে থেকে স্বামীকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে নির্মম নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছে। আমি স্বামী হত্যার বিচার চাই। জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’

এবিএম ফজলে করিমের নির্দেশে আবু জাফর চেয়ারম্যানকে অপহরণ করা হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। লন্ডনভিত্তিক একটি অনলাইন টিভি চ্যানেলের টকশোতে সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা হাসিনুর রহমান দাবি করেন, ২০০৮ সালের শেষদিকে রাউজানের একজন এমপি আমাকে একজন চেয়ারম্যানকে গ্রেপ্তার করে ক্রসফায়ার করতে বলে। সে এমপির আমি কথা শুনিনি।’

২০১০ সালের ২৭ মার্চ থেকে পরিবারের সদস্যরা সৈয়দ আবু জাফরের প্রতীক্ষায় আছেন। বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তার সন্তান জিসানুর রহমান।

চট্টগ্রাম উত্তর জেলা যুবদলের সহসভাপতি সাবের সুলতান কাজল কালবেলাকে বলেন, ‘ফজলে করিম চৌধুরীর অত্যাচার-হয়নারি এত পরিমাণে ছিল যে মাটিও কান্না করত। আমার বিরুদ্ধে তিনি ৫০টির অধিক মামলা দিয়েছিলেন। চট্টগ্রাম নগর থেকে শুরু করে এমন জায়গা নেই, যেখানে তিনি আমার বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য মিথ্যা মামলা দেননি। আওয়ামী লীগের গত ১৬ বছরে কখনো এলাকায় যেতে পারিনি।’

Share on Google Plus

About Online News

0 comments:

Post a Comment

আপনি কি স্ত্রীর অর্গাজম ঘটাতে পারেন? নাকি সে শুধু অভিনয় করে ?

রাতের নিস্তব্ধতা। পাশে শুয়ে থাকা মানুষটার নিঃশ্বাসের শব্দ ছাড়া আর কোনো আওয়াজ নেই। শারীরিক মিলনের পর এই যে শীতল, অস্বস্তিকর নীরবতা—এটা কি শান...